ঢাকাবুধবার , ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

উচ্চকক্ষের প্রয়োজনীয়তা ও প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ নিয়ে প্রশ্ন

বাংলার সময় TV
সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২৬ ১০:২৭ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, আমরা এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি কী প্রক্রিয়ায়, কাদের নিয়ে এবং কোন পদ্ধতিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন হবে। কিছু প্রস্তাব জাতীয় সনদে আছে, কোথাও কোথাও ভিন্নমত আছে। আমরা বলেছি, বিষয়টি সংসদের ওপর ছেড়ে দিই। একই সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিকল্পগুলো প্রণয়নের জন্য সবাইকে প্রস্তাব দিতে এবং পত্রপত্রিকায় এ নিয়ে আলোচনা করার আহ্বান জানানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।

গতকাল মঙ্গলবার সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির চতুর্থ বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।

বৈঠকে দেশের বিভিন্ন ইলেকট্রনিক, টেলিভিশন ও অনলাইন মিডিয়ার প্রতিনিধি এবং টকশোতে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিরা অংশ নেন। তারা জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী সংসদে উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা এবং একজন ব্যক্তির সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী থাকার প্রস্তাব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। একই সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, ক্ষমতার পৃথকীকরণ, গণমাধ্যম ও বাকস্বাধীনতা এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার বিষয়েও মতামত দেন তারা।

বৈঠক শেষে সংসদের মিডিয়া সেন্টারে কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, মোটাদাগে বেশ কয়েকটি দফার ওপর গণমাধ্যম প্রতিনিধিরা বক্তব্য দিয়েছেন এবং কিছু রাজনৈতিক পরামর্শ দিয়েছেন। তারা বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেন, আমাদের আলোচনার দ্বারও উন্মুক্ত। আপনাদের মাধ্যমে আহ্বান জানাই, তারা যেন সংবিধান সংশোধন কমিটিতে নাম দেন, অন্তর্ভুক্ত হন এবং আলোচনায় আসেন। কারণ আমরা সবার সঙ্গে আলোচনা করে অংশগ্রহণমূলক একটি সংশোধনী আনতে চাই।

দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও বৈঠকে প্রশ্ন উঠেছে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রস্তাব আসছে, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্টের আদৌ বাংলাদেশের প্রয়োজন আছে কি না। যেহেতু এটা এককক্ষবিশিষ্ট এবং আমাদের সংবিধানে বলা আছে—এটা একক, স্বাধীন, সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্র; এখানে কোনো অঙ্গরাজ্যের ব্যবস্থা নেই। সেই বিবেচনায় তারা বলেছেন, এটা কি পুনর্বিবেচনা করা যায়?

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আমরা জুলাই জাতীয় সনদে একমত হয়েছি যে, আমরা দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্ট গঠন করব। সে হিসেবে আমরা যেতে চাই। তবে তারা যে প্রস্তাব দিয়েছেন, সেটা পার্লামেন্টে বিবেচিত হলে সরকারি দল ও বিভিন্ন দল তা বিবেচনা করবে। তখন দেখা যাবে।

ঐকমত্য কমিশনে বিএনপির পক্ষ থেকে যেসব বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে, সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মতের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সেসব বিষয়ে কিছুটা ছাড় দেওয়ার ইচ্ছা আছে কি না জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিরোধী দল আলোচনায় এলে আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে জুলাই জাতীয় সনদের কিছু কিছু অংশে তারা যদি ব্যত্যয় ঘটাতে চান, সেটাও আলোচনা হতে পারে। তবে আমরা জুলাই জাতীয় সনদ যেভাবে প্রণীত ও স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেভাবেই তা বাস্তবায়ন করতে চাই। বিরোধী দলের কোথাও কোনো বক্তব্য থাকলে সমঝোতার ভিত্তিতে সেটা করা যেতে পারে। কিন্তু সেজন্য তো তাদের আলোচনায় আসতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী পদে একজনের সর্বোচ্চ ১০ বছরের মেয়াদ নিয়ে নতুন কোনো প্রস্তাব বা ভাবনা আছে কি না জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কেউ কেউ বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ ১০ বছর নির্ধারণ করে দেওয়া অগণতান্ত্রিক এবং এতে গণতান্ত্রিক অধিকার ক্ষুণ্ন হয়। তিনি বলেন, কেউ ভালো কাজ করলে জনগণ চাইলে তাকে আবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে পারে—এটা তার অধিকার। তবে জুলাই জাতীয় সনদ হওয়ার সময় আমরা দলের পক্ষ থেকে এ প্রস্তাব দিয়েছি। আমাদের প্রধানমন্ত্রী তখন দলের চেয়ারম্যান ছিলেন, তিনি প্রস্তাবগুলো দিয়েছিলেন। পরে দলের স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্ত এবং নির্বাচনি ইশতেহারেও আমরা তা উল্লেখ করেছি। সুতরাং আমরা এ অবস্থান থেকে সরে আসিনি। পার্লামেন্টে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে কোনো প্রস্তাব এলে তখন আলোচনা হতে পারে। তবে আমরা এখনো আমাদের অবস্থানেই আছি।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় বাদ পড়া পাঁচটি সংস্কার কমিশনের সুপারিশকে সংবিধান সংশোধনের আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করার কোনো চিন্তা আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বাকি সংস্কার কমিশনগুলোর প্রতিবেদন এখানে আনার সুযোগ এখন নেই। তিনি বলেন, সরকার চাইলে জনদাবির পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়ভিত্তিক আরও সংস্কার কমিশন গঠন করে পরামর্শ নিতে পারে। যেমন মিডিয়া সংস্কার কমিশন গঠন করে এর সুপারিশ বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। তবে এগুলো জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা নয়।

বাংলাভিশনের প্রধান সম্পাদক ড. আবদুল হাই সিদ্দিক বলেন, সাংবিধানিক সংস্কারের মূল লক্ষ্য হলো গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সত্যিকার অর্থে স্বাধীন ও কার্যকর করা। বিশেষ করে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা শক্তিশালী করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তিনি বলেন, আজকের আলোচনায় আমরা বলেছি, সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে বিরোধী দলকে অবশ্যই আলোচনায় রাখতে হবে। জুলাইয়ের চেতনায় বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। বিরোধী দলকে আলোচনায় এনে তাদের সম্মতি নেওয়ার চেষ্টা করতে হবে, তাহলেই সংশোধনটি সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে। এ ছাড়া, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, নির্বাচন কমিশন ও দুর্নীতি দমন কমিশনকে শক্তিশালী করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি।

যমুনা টেলিভিশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ফাহিম আহমেদ বলেন, সবাই বলেছেন, সংবিধান সংশোধন যেন দীর্ঘমেয়াদি হয় এবং বারবার পরিবর্তনের প্রয়োজন না পড়ে। তিনি বলেন, জুলাই সনদে নোট অব ডিসেন্ট ছাড়া যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়ন এবং নোট অব ডিসেন্ট থাকা বিষয়গুলো রাজনৈতিক দলগুলোর আলোচনার মাধ্যমে বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে বিরোধী দলসহ সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সব রাজনৈতিক দলকে নিয়ে আলোচনার ভিত্তিতে সংশোধন করা হলে তা কম বিতর্কিত ও বেশি গ্রহণযোগ্য হবে।

টকশো ব্যক্তিত্ব ডা. সাখাওয়াৎ হোসেন সায়ন্ত বলেন, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের প্রয়োজন আছে কি না—এমন প্রশ্ন কেউ কেউ তুলেছেন। আজকের আলোচনায় অতিথিরা এ বিষয়ে মতামত ও প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি বলেন, কমিটি আরও কয়েকটি অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করেছে এবং সামনে আরও করবেন। সবার মতামত বিবেচনা করেই উচ্চকক্ষের প্রয়োজনীয়তা, এর আর্থিক ব্যয় ও দেশের জন্য এর কার্যকারিতা বিবেচনা করতে হবে।

বৈঠকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, ক্ষমতার পৃথকীকরণ, গণমাধ্যম ও বাকস্বাধীনতা এবং নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থার স্থায়ী সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

বৈঠকে আরও অংশ নেন আরটিভির বার্তাপ্রধান ইলিয়াস হোসেন, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রধান বার্তা সম্পাদক মোস্তফা আকমল, এটিএন বাংলার কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এডিটর একরামুল হক সায়েম, চরচা ডটকমের সম্পাদক সোহরাব হাসান প্রমুখ।

বৈঠকে কমিটির সদস্য ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, জয়নুল আবেদীন, মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, মো. নুরুল হক, মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, ফারজানা শারমীন ও মো. মাহমুদুল হক রুবেল উপস্থিত ছিলেন।

এ ছাড়া, জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব ব্যারিস্টার মো. গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো। বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।